লামিসা তাসনিম জুহা, বিশেষ প্রতিনিধি


 

 

মানুষের জীবনের ক্ষত যখন মানসিকভাবে গুরুতর আঘাত আনে, তখনই মস্তিষ্ক নিজেকে রক্ষা করতে কিছু স্মৃতি সাময়িকভাবে মুছে ফেলে। যদিও সেই স্মৃতি আজীবন এর জন্য লোপ পায় না, কিন্তু তা সহজে মনে করাও যায় না। এমনই সমস্যাকে মনোবিজ্ঞানীরা “ডিসোসিয়েটিভ অ্যামনেশিয়া” (Dissociative amnesia) নামে চিহ্নিত করেছেন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

ফরাসি মনোবিজ্ঞানী ‘পিয়ের জানে’ ১৮৮৯ সালে প্রকাশিত তাঁর গবেষণায় ট্রমাজনিত ডিসোসিয়েশন ও স্মৃতি বিচ্ছিন্ন হওয়ার ধারণা উপস্থাপন করেন, যা পরবর্তীতে ‘ডিসোসিয়েটিভ অ্যামনেশিয়া’ আধুনিক ধারণার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

ডিসোসিয়েটিভ অ্যামনেশিয়া’ রোগে আক্রান্ত হওয়ার পিছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে যেমন:শৈশবে শারীরিক, মানসিক বা যৌন নির্যাতন। কারও ক্ষেত্রে পারিবারিক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা, দীর্ঘদিন তীব্র মানসিক চাপের মধ্যে থাকা । এক কথায় বলতে গেলে, এমন কোনো ঘটনা যা ব্যক্তির জীবনে দৃঢ় ক্ষতের দাগ কেটে গেছে।

 

 

 

এই রোগের ফলে বেশ কিছু সমস্যা দেখা যায় যেমন হঠাৎ করে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মনে না থাকা।আবার কেউ নিজের পরিচয় বা অতীত সম্পর্কেও বিভ্রান্ত হয়ে পড়তে পারেন। অনেক সময় নিজের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন লাগা বা চারপাশ অবাস্তব মনে হওয়া।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

এ রোগের বেশ কয়েকটি ধরণ রয়েছে —
• স্থানীয় স্মৃতিভ্রংশ (Localized Amnesia): নির্দিষ্ট সময়ের স্মৃতি হারিয়ে যাওয়া, এটি সবচেয়ে সাধারণ ধরণ।

•নির্বাচনমূলক স্মৃতিভ্রংশ (Selective Amnesia): কোনো ঘটনার কিছু অংশ মনে থাকা, কিছু অংশ ভুলে যাওয়া।

• সার্বিক স্মৃতিভ্রংশ (Generalized Amnesia):নিজের পরিচয়সহ অতীতের অধিকাংশ স্মৃতি হারিয়ে যাওয়া।

•বিষয়ভিত্তিক স্মৃতিভ্রংশ (Systematized Amnesia): নির্দিষ্ট ব্যক্তি, স্থান বা বিষয় সম্পর্কিত স্মৃতি হারিয়ে যাওয়া।

•ধারাবাহিক স্মৃতিভ্রংশ(Continuous Amnesia):একটি নির্দিষ্ট ঘটনার পর থেকে নতুন স্মৃতি মনে রাখতে অসুবিধা হওয়া।

 

 

অনেক ক্ষেত্রেই এ রোগে আক্রান্ত রোগীদেরকে সাধারণ ভুলে যাওয়ার সাথে তুলনা করা হয়, এটি মোটেও তা নয়। আবার সমাজে এখনো মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে । অনেকেই এমন সমস্যাকে অভিনয়, দুর্বলতা বা ইচ্ছাকৃত আচরণ বলে মনে করেন। অথচ ‘ডিসোসিয়েটিভ অ্যামনেশিয়া’ একটি স্বীকৃত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে এবং যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।

 

 

 

‘ডিসোসিয়েটিভ অ্যামনেশিয়া’ রোগের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে অবশ্যই ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে। এ রোগের চিকিৎসায় সাইকোথেরাপি, ট্রমা ফোকাসড থেরাপি, Cognitive behavioral therapy, পারিবারিক কাউন্সিলিং ইত্যাদি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে স্মৃতি ফিরে আসে, আবার অনেকের ক্ষেত্রে হঠাৎ স্মৃতি ফিরে আসে। তবে ব্যতিক্রম কিছু মানুষ আছে যাদের স্মৃতি স্থায়ীভাবে হারিয়ে যেতে পারে।

 

 

 

 

বাংলাদেশে মানসিক সমস্যা নিয়ে বিভিন্ন কুসংস্কার দেখা যায়। মানসিক রোগে আক্রান্ত হলেই তাকে ‘পাগল’ হিসেবে ধরা হয় ,অলৌকিক শক্তির প্রভাব, কালো জাদু, ধর্মীয় অনুশাসনের ঘাটতি বলে আখ্যায়িত করে তারা। সম্মানহানির ভয়ে অনেকে তাদের সমস্যাগুলো গোপন রাখে, কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের শরণাপন্ন হন না। এমন মন মানসিকতা কোন সমাজের ভিত্তি হতে পারে না। শারীরিক রোগের মতো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাও একটি বাস্তব এবং এর চিকিৎসার ও প্রয়োজন আছে। তাই মানসিক স্বাস্থ্য জড়িত সমস্যা নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।