মতিঝিলের ৮১ নম্বর ঠিকানায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘বাংলার বাণী’ ভবনটি এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ৫৩ বছরের পুরনো এই ভবনটির দেয়ালে জড়িয়ে আছে অনেক রাজনৈতিক ইতিহাস। এক সময় এখান থেকে উর্দু ভাষায় খবর ছাপা হতো এবং পরবর্তীতে এটি প্রভাবশালী বাংলা দৈনিক প্রকাশের কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠে। তবে ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে ভবনটি বারবার দখলের চেষ্টার মুখে পড়েছে। বর্তমানে ভবনটির বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা, যার নেপথ্যে রয়েছেন দলটির সভাপতি ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভবন সংশ্লিষ্টদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় পুরো ভবনটি এখন তাদের কব্জায়, কেবল একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবহৃত অংশ ছাড়া। শুধুমাত্র একটি বেসরকারি ব্যাংকের কার্যক্রমে ব্যবহার হওয়া অংশ তারা দখলে নিতে পারেনি। ভবনে থাকা একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, কর্মচারী, আশপাশের ভবনে চাকরি করেন এমন ব্যক্তি ও স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেও এর সত্যতা মিলেছে। তারা ওই ভবনে কিছুদিন প্রভাব বিস্তার করেন।
৫ই আগস্টের পর ভবনটিতে বিক্ষুব্ধ জনতা একবার হামলা চালায়। এরপর সমন্বয়ক পরিচয়ধারী কিছু ব্যক্তি ভবনটি দখলের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়, পরে বিএনপির কিছু নেতাকর্মীও সেখানে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে সরে দাঁড়ান। শেষ পর্যন্ত গণঅধিকার পরিষদের নেতারা ভবনটির নিয়ন্ত্রণ নেন। দলটির সভাপতি নুরুল হক নুরের নির্দেশেই ভবনের দু’টি ফ্লোর তালাবন্ধ করে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। ভবনের পেছনের অংশে ‘পানসি’ নামে একটি রেস্টুরেন্ট খোলা হয়েছে, যার মালিকানায় গণঅধিকার পরিষদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের নাম শোনা যাচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, নুরুল হকের আত্মীয় পরিচয় দেয়া সারোয়ার হোসেন সানী এবং বিএনপি’র অঙ্গসংগঠনের সাথে যুক্ত সুমন নামে এক নেতা ভবনটির নিয়ন্ত্রণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন।
ভবনটির আইনি মালিকানা আওয়ামী লীগ নেতা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের পরিবারের হাতে। গণ-অভ্যুত্থানের কয়েকদিন আগেই তিনি বিদেশে পাড়ি জমান। সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনের নিচতলায় প্রিমিয়ার ব্যাংকের কার্যক্রম চললেও তিন ও চারতলায় অবস্থিত শেখ তাপসের ল’ চেম্বার ও রাজনৈতিক কার্যালয়ে প্রবেশের পথে কেচিগেটে তালা ঝুলছে। ব্যাংকের সূত্র জানিয়েছে, ২০০২ সাল থেকে বৈধ চুক্তির ভিত্তিতে তারা ভাড়াটিয়া হিসেবে আছে। গণ-অভ্যুত্থানের দু’দিন পর দুর্বৃত্তরা তাপসের কার্যালয়ের জিনিসপত্র লুট করে নেয়। পরবর্তী সময়ে দখলদাররা ব্যাংকের ভাড়ার টাকা নিজেদের কাছে দাবি করলেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বৈধ কাগজপত্র না থাকায় তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। উল্টো ভাড়া না দিলে শাখা সরিয়ে নেয়ার হুমকির অভিযোগও পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুজ্জামান তালুকদার জানিয়েছেন, ভবন দখলের বিষয়ে থানায় কোনো অভিযোগ আসেনি এবং বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন। ভবনের বর্তমান দখলদারির বিষয়ে স্থানীয়ভাবে নানা গুঞ্জন থাকলেও সংশ্লিষ্টদের অনেকেই নাম প্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছেন। পার্শ্ববর্তী ভবনের সিকিউরিটি গার্ড আশিক জানান, এক সময়ের আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণাধীন এই ভবনটি এখন অন্য গোষ্ঠী দখলে নিয়েছে। বর্তমানে রেস্টুরেন্টের পাশে থাকা ‘ওহ চিটাগাং’ নামক দোকানের মালিক মামুন বাবু জানান, তিনি বিএনপি’র রাজনীতির সাথে যুক্ত সুমনের কাছ থেকে জায়গাটি ভাড়া নিয়েছেন। মতিঝিল মেট্রো স্টেশনের নিচে ব্যস্ত সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে আছে বহু ইতিহাসের সাক্ষী চারতলা ভবনটি। রেস্টুরেন্টের পাশে, একই ভবনে ছোট পরিসরে করা পান, সিগারেট, ডাবসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রেতা ‘ওহ চিটাগাং’ নামের প্রতিষ্ঠানের মালিক মামুন বাবু বলেন, আমি ৬ হাজার টাকা ভাড়ায় সুমনের কাছ থেকে দোকানটি ভাড়া নিয়েছি।
ভবনটির ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ১৯৭১ সালের আগে এটি ছিল পাকিস্তানপন্থি উর্দু দৈনিক ‘পয়গাম’-এর কার্যালয়। স্বাধীনতার পর এটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে রাষ্ট্রের অধীনে চলে যায়। ১৯৭২ সালে শেখ ফজলুল হক মণি এর দায়িত্ব নেন এবং এখান থেকে ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। ১৯৭৩ সালে জার্মানি থেকে আনা আধুনিক ‘গজ অফসেট প্রিন্টিং মেশিন’ বসিয়ে তিনি প্রকাশনায় নতুন মাত্রা যোগ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট শেখ মণি নিহত হওয়ার পর ভবনটির ওপর থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ আলগা হয়ে যায়। পরবর্তী সামরিক শাসনামলে ভবনটি বিভিন্ন সময় সরকারি নিয়ন্ত্রণে এবং পরিত্যক্ত সম্পত্তির মামলার জালে আটকে ছিল।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় এলে শেখ ফজলে নূর তাপস ভবনটির দখল ফিরে পান এবং সেখানে তার রাজনৈতিক অফিস ও ল’ চেম্বার স্থাপন করেন। ওই বছরের ২১শে অক্টোবর ভবনটির নিচে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, যা মূলত শেখ তাপসকে লক্ষ্য করেই চালানো হয়েছিল বলে সে সময় দাবি করা হয়েছিল। সময়ের পরিক্রমায় বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে ভবনটি আবারও নতুন হাতবদলের শিকার হলো। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নাম ভাঙিয়ে যারা একে ‘ফ্যাসিবাদের প্রতীক’ ঘোষণা করে দখলমুক্ত করার দাবি তুলেছিল, তাদের অনেকেই এখন সরে দাঁড়িয়েছেন এবং ভবনটির নিয়ন্ত্রণ এখন নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।